ঢাকা বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬

পর্যটনে পরিবেশের প্রভাব-সজল জাহিদ

কাল ছিল পরিবেশ দিবস। কদিন থেকে এই বিষয় নিয়ে লিখবো লিখবো করেও নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলাম। কারন এই নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই আমার মাথা প্রচণ্ড গরম হয়ে যায়। কারন আমাদের দেশের যেখানেই যাইনা কেন এই পরিবেশ বিষয়টা আমাকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দেয় আর মেজাজটা খারাপ করে দেয়। দেশ ঘোরা (৬৩ জেলা) শেষ করেছি সেই ২০১০ সালেই।

এরপর আমি ভারত দেখতে বেরিয়েছি। ভারত দেখার স্বাদ মিটলে আমি অন্যদেশে হাত দেব। তো যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় পুরোটা আর ভারতের বেশ কিছু যায়গায় যাওয়া হয়েছে তাই স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের পর্যটন পরিবেশের সাথে ওদের পর্যটন পরিবেশের কিছু তুলনা এসেই যাবে।

আজকে পরিবেশ দিবসে কথা যদি মাথায় রাখি আর যেহেতু ঘুরতে ভালোবাসি তাই আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য কয়েকটা পর্যটন স্পটের সর্বশেষ আমার দেখা চিত্র নিয়ে কিছু বলি, কি বলেন?

তার আগে আমার একটা প্রশ্ন এই গ্রুপের সবার কাছে, আর সেটা হল…

একটু ভেবে দেখুন তো, আপনি, আমি এই আমরা কি আমাদের নিজেদের ঘরে, বিছানায়, বেলকোনিতে ময়লা ফেলি? নিশ্চয়ই না। কিন্তু এই আপনি আর আমি আমরাই যখন কোথাও বেড়াতে যাই, পাহাড়ে বা সমুদ্রে বা কোন অরণ্যে অথবা কোন নদীর ধারে, তখন দেখেন চকলেট, চিপস, চুইংগাম, সিগারেট, কোক এর বোতল এগুলোর ব্যবহার শেষ হলে ঠিক সেখানেই বা রাস্তায় ফেলে আসি বা দেই। হয়তো আপনি সবাই এটা করেনা, কিন্তু আমরা অধিকাংশরাই এটা করে থাকি, ভেবে দেখুন।

অথচ আপনি কি জানেন, এই আপনি আর আমি, আমরা মিলেই কিন্তু আমাদের পরিবেশ আর সেই সাথে আমাদের প্রিয় পর্যটনকে অনেকটা এগিয়ে নিতে পারি? হ্যাঁ শুধু আপনি আর আমি, আমাদের একক উদ্যেগ আর কোন রকম ব্যয়হীন পদক্ষেপই আমাদের পরিবেশকে সুন্দর করে, পর্যটনকে আকর্ষণীয় আর এগিয়ে নিতে পারে। এতে কারো কাছে কোন কিছুর জন্য হাত পাততে হবেনা, কারো কাছে কোন অনুমোদন নিতে হবেনা, কারো কাছে কোন কৈফিয়ত দিতে হবে। জাস্ট আমাদের একটু আন্তরিক উদ্যেগই পারে আমাদের পরিবেশকে সুন্দর করে পর্যটনকে এগিয়ে নিতে।

গত বছর পরিবার নিয়ে বিছানাকান্দি গিয়েছিলাম। এখন সেই চিত্রর কথা বলতে গেলেই বলবেন দালাল এসেছে দেখো। কি দারুণ পাহাড়, ঝর্ণা, বৃষ্টি সব কি সুন্দর আর মনোমুগ্ধকর, মনে হয় যেন তাকিয়েই থাকি আর তাকিয়েই থাকি কিন্তু ওগুলো আমাদের দেশের সম্পদ না, অন্য দেশের সম্পদ। কিন্তু যেই পাহাড় আর ঝর্ণা থেকে নিজের দেশের পাথর আর নদীতে চোখ রাখি অমনি ভালো মনটা খারাপ হয়ে গেছে নিমিষেই! কেন জানেন? দেখি পাথরে গেছে আছে, পানিতে ভেসে আছে আর নদীতে ভেসে যাচ্ছে ওইসব চিপস, চকলেট, সিগারেট, বিস্কিট আর এমন নানা রকম খাবারের প্যাকেট। আর বিরিয়ানির প্যাকেট তো আছেই।

আমার প্রশ্ন হল এগুলো কি ওপার থেকে এসেছে, এগুলো কি ঝর্ণায় উৎপত্তি হয়েছে? নাকি নদী ফুড়ে বেরিয়েছে? নারে ভাই না। এগুলো আপনি, আমি আর আমরা বা আমাদের মতই কেউ কেউ খেয়ে দেয়ে ফেলে এসেছি ওখানে। আর এই আমাদের কারনেই অমন অপার্থিব একটা যায়গা নোংরায় ভোরে গেছে। দেখলে গা ঘিনঘিন করে, পা দিতে ইচ্ছা করেনা আর পানিতে। অথচ বাংলাদেশের আর কোথায় পাহাড়, নদী, ঝর্ণা, মেঘ, বৃষ্টির এমন সম্মীলন নেই। কিন্তু সেটাকে আমরাই ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলছি। তার উপর তো আছেই সেখানে নানা রকম দোকান আর তার বিকিকিনি।

তার আগের বছর গেলাম সেন্ট মারটিন। যেখানে অন্যান্য বার ওখানে গেলে যেতে যেতেই আনন্দে আত্নহারা হয়ে যাই, আর ফিরতে ইচ্ছা করেনা, সেখানে গত বছর যখন গেলাম, ইচ্ছে হচ্ছিল সাথে সাথে যদি ফিরে আসতে পারতাম! এতটাই মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কারন কি জানেন? কারন হল বীচের যেদিকে তাকাই সেখানেই দেখি পরিত্যাক্ত ডাবের খোসার ছড়াছড়ি! আর অন্যন্য খাবারের প্যাকেট তো আছেই। তাই আবারো সেই প্রশ্ন এসে যায়, এগুলো কারা ফেলেছে? আমরাই তো তাই না? আর ওখানে বীচে ঘেঁসে যে দোকান গুলো গড়ে উঠেছে সেগুলোর কল্যানে।

ঠিক একই অবস্থা কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, সাজেক, রাঙ্গামাটি, সিলেট সহ দেশের অন্যান্য সকল পর্যটন স্পটেরই। শুধু পরিবেশের কারনেই আমাদের অনেক নান্দনিক পর্যটন স্পট তার নান্দনিকতা হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যেটা চাইলেই আপনি আমি আর আমরা মিলেই ঠিক রাখতে পারি। কিন্তু কিভাবে? এসব যায়গায় গিয়ে কি খাবোনা, এসব নিয়ে যাবনা বা কিনবোনা?

নাহ তা কেন? অবশ্যই যাবো, যা দরকার হবে কিনবো, খাবো, শুধু যদি আপনি আমি এইসব যায়গায় গিয়ে নিজেদের ব্যাবহারের এসব প্যাকেটগুলো সাথে করে নিয়ে আসি বা তা না পারলেও সাময়িকভাবে নিজেদের কাছে রেখে পরে সুযোগ মত সেটা সঠিক যায়গায় ফেলে দেই, তবেই কিন্তু ওইসব যায়গায় আর ময়লা থাকেবা, ময়লা হবেনা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকবে, আর আমাদের পর্যটন আরও বেশী মানুষকে আকৃষ্ট করবে। দেশে বা দেশের বাইরেও।

ভেবে দেখুন এই নোংরা পরিবেশের কারনেই অনেক মানুষ আজকাল দেশের অনেক যায়গায় যেতে চায়না। সেই টাকার সাথে আরও কিছু টাকা মিলিয়ে অন্য দেশে বেড়াতে যায়। শুধুই পরিবেশের কথা ভেবে। অথচ আমাদের পাশের দেশের দিকে যদি তাকান, এক দার্জিলিং আর দিল্লীর কিছু যায়গা ছাড়া অন্যান্য সকল পর্যটন স্পটের দিকে যদি তাকান আর আমাদের সাথে তুলনা করেন তাহলে দেখতে পারবেন ওরা কতটা পরিবেশ আর পর্যটন সচেতন। নিজেরা তো ময়লা ফেলেইনা, অন্য কাউকে ফেলতে দেখলেই একদম ক্ষেপে ওঠে! যার সর্বশেষ উদাহারন আমাদের গোয়া ট্রিপে।

একজন আঞ্জুনা বীচ থেকে ফেরার পথে গাড়িতে ডাব নিয়ে উঠেছিল। ডাব শেষ করে ফাঁকা রাস্তায় সেটা ছুড়ে মেরেছিল জানালা খুলে। তারপর সেটা দেখে অন্য গাড়ি সামনে এসে থামিয়ে আর আমাদের ড্রাইভার মিলে সেই লোককে কি হেনস্থাই না করলো বলে বোঝানোর মত নয়। অথচ সেই ডাব কিন্তু কারো কোন ক্ষতি করেনি, গাড়িতে লাগেনি বা অন্য কোন কিছু। শুধু কেন ওটা রাস্তায় ফেলল সেজন্যই ওনাকে চূড়ান্ত অপমানিত হতে হয়েছিল! শুধু পরিবেশের, ওদের ভালোবাসার গোয়ার, ওদের সেরা পর্যটন স্পটের নোংরা হবার আশঙ্কায়।

এবার ভেবে দেখুন তো, আমরা কি এটা কেউ করি? করতাম বা ভাবতাম? নাহ একদম না। আমাদের কি? যে ফেলেছে ফেলেছে! আমার তো কোন ক্ষতি হয়নি তাই যা করে করুক! এসব দেখার কেউ নেই আমাদের। দরকার নেই ভাই। আসুন আপনি-আমি আর আমরা মিলেই তো আমাদের নিজেদের পরিবেশ আর পর্যটন সম্পদকে পরিচ্ছন্ন করে তুলতে পারি, রাখতে পারি। একা বা মাঝে মাঝে সম্ভব হলে দলগতভাবে।

আমরা কেন পারিনা আমাদের কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট, বিছানাকান্দিসহ অন্যান্য সকল যায়গা কে সুন্দর আর ঝকঝকে রাখতে, কেন পারিনা ওদের সিমলা-মানালির মল রোডের মত সবকিছু ঝকঝকে আর তকতকে রাখতে?

এটার জন্য তো টাকা পয়সার দরকার নাই, সরকারী সহয়তার প্রয়োজন নাই, কারো অনুমোদন আর দয়ার দরকার নাই। এটা আপনার আমার আর আমাদের হাতেই আছে, রয়েছে আর থাকবেও। আমাদের পরিবেশ, আমাদের পর্যটন আর আমাদের আগামী আমরাই আকর্ষণীয় করতে পারি, শুধু পরিবেশ সচেতন থেকে, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রেখে আর নিজেদের পাশাপাশি অন্যদেরকে সাধ্যমত সচেতন করে।

আসুন আজকে এই পরিবেশ দিবসে যে যার নিজের কাছে কথা দেই, যেখানই থাকিনা কেন, যেখানই যাই না কেন আমি পরিবেশের ও পর্যটনের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবো না আর সচেতনভাবে কাউকে করতেও দেবনা। তবেই দেখবেন আমাদের পরিবেশ আর পর্যটন কিভাবে এগিয়ে যায় সামনের দিকে।
সবাইকে পরিবেশ দিবসে নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিচ্ছন্ন থাকার আর রাখার আশাবাদ রেখে। শেষ করছি।

আসুন না আজ থেকে প্রতিটি পর্যটন স্পটকেও নিজের বারান্দা বা বেলকোনি বা নিজের ঘর ভাবি। তাহলে দেখবেন আর পরিবেশ নোংরা করার কথা মাথায় আসবেনা। ময়লা ফেলার আগেই মনে পরবে আরে এটা তো আমারই ঘর, বারান্দা বা বেলকোনি?